১৫ আগস্টের স্মৃতিচারণ করেন সাহান আরা বেগম-বরিশাল নিউজ

বরিশাল নিউজ ।। ১৫ আগস্ট মিন্টু রোডের বাসায় হামলার সময় শেষ দেখা হয় স্বামী আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ সাথে। তারপর তার স্বামীর কী হয়েছে,বেঁচে আছেন কিনা তাও জানতে পারেননি। প্রায় ছয় মাস পর কোলকাতায় স্বামীর সাথে দেখা হয় সাহান আরা বেগমের। সেখানে দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে হাসানাত স্বজন হারানোর কষ্ট ভোলার চেষ্টা করছিলেন জানান সাহান আরা আবদুল্লাহ।
আগস্টের শেষ দিনে বরিশালে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় শোকাবহ আগস্টের স্মৃতিচারণ। সেখানে নির্মমমতার শিকার বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে বউ সাহান আরা বেগম এভাবেই বলছিলেন তাদের অনিশ্চিত জীবনের কথা। আবদুর রব সেরনিয়াবাত এর বাসায় অবস্থান করা বরিশালের কয়েকজন শিল্পী তাদের উপর হামলার ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন। এ সময় তাদের কথা শুনতে অনুষ্ঠানস্থলে নেমে আসে পিনপতন স্তব্ধতা।

 ১৫ আগস্টের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে শহীদদের জন্য দোয়া-বরিশাল নিউজ


‘বেঁচে থাকলে মায়ের প্রতি খেয়াল রেখো’

সেই নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনায় সবাই যখন হাসানাতকে পালিয়ে যেতে অনুরোধ করেন হাসানাত তখন তার স্ত্রীকে বলেন,”তুমি বেঁচে থাকলে মায়ের প্রতি খেয়াল রেখ” এটি ছিল সাহান আরা বেগমের সঙ্গে তার স্বামী আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর শেষ কথা।
১৫ আগস্টের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নাজরিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ভোররাতে ফজরের আজানের কিছু সময় পর হঠাৎ করেই প্রচণ্ড শব্দে বাড়ির সবার ঘুম ভেঙে যায়। সবাই বুঝলাম গুলির শব্দ হচ্ছে। দৌড়ে সন্তানদের নিয়ে আমার শ্বশুর ও তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাতের কক্ষে যাই।
‘তখন আমার শাশুড়ি আমেনা খাতুন তার ভাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ফোন দিতে বলেছিলেন শ্বশুরকে। এরপর একই কথা আমাকে বললে-আমিও মণি ভাইকে ফোন দিই। তিনি দেখতে বলেছিলেন কারা? কিন্তু অনবরত গুলি ছোড়ার কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে ঘাতকেরা বাড়ির দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং আমার শ্বশুরের কক্ষ থেকে সবাইকে নিচে নামিয়ে নেয়।’
সাহান আরা আব্দুল্লাহ বলেন, নিচে নিয়ে ঘাতকেরা আমাকে জিজ্ঞাসা করে বাড়ির আর কোনো সদস্য বাকি আছে কি-না? তখন আমি শ্বশুরের দিকে তাকাতেই বুঝে যাই যে, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর কথা যেন না বলি। সেদিন বাসায় থাকা ক্রিসেন্ট ব্যান্ড দলের সদস্যদেরও আমাদের পাশে এনে দাঁড় করানো হয়।

হাসানাত ভাবা হয় শহিদ সেরনিয়াবাদকে
সাহান আরা বেগম বলেন, আমার বড় ছেলে সুকান্ত বাবু আমার কোলে উঠতে চেয়েছিলো। কিন্তু আমার কোলে ছিলো বরিশাল সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র ও ওই সময়ে দেড় বছরের শিশু সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। সুকান্তর আকুতিতে তাকে কোলে তুলে নেন আমার ভাসুর শহিদ সেরনিয়াবাত ভাই।

হত্যাকারীরা সুকান্ত বাবুকে শহিদ ভাইয়ের কোলে দেখে তাকেই হয়তো ওরা হাসানাত ভেবেছিলো! তাই তার পিঠে অস্ত্র ঠেকিয়ে ব্র্যাশ ফায়ার করা হয়। তিনি মুহূর্তের মধ্যেই সুকান্তকে নিয়ে উপুর হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আর আমার শ্বশুরকে দেখেছি তার বুকে হাত দিয়ে চেপে রাখতে, কারণ সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেড় হচ্ছিলো। সবাইকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে চলে যাওয়ার পরে আবারো ঘাতকেরা বাড়ির ভেতর ঢোকে এবং সবার মৃত্যু নিশ্চিত করতে আবারো গুলি চালায়।’

ওইদিন আহত হলেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া সাহান আরা বলেন, “সেদিনের ওই নারকীয় হত্যাকাণ্ডে আমাদের বাড়িতে আমার শ্বশুর আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ছাড়াও শহীদ হন আমার শিশুপুত্র সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাত, ননদ বেবী সেরনিয়াবাত, দেবর আরিফ সেরনিয়াবাত, ভাসুর শহিদ সেরনিয়াবাত ও আবদুল নঈম খান রিন্টু। আর আহত হন আমার শাশুড়ি, ননদ ও ক্রিসেন্ট ব্যান্ডের সদস্যসহ আরো অনেকে।”

১৫ আগস্টের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন-বরিশাল নিউজ


হাসানাতকে পালাতে বলেছিলেন রমনার ওসি

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর স্ত্রী সাহান আরা বলেন, ঘাতকেরা চলে যাওযার পর আমার স্বামী বের হয়ে আসেন। বাবার হাতে পালস ধরেই নির্বাক হয়ে বসে পড়েন তিনি। এরই মধ্যে বাসায় রমনা থানার তৎকালীন ওসি আসেন। তিনি শ্বশুরের কথা জিজ্ঞাসা করতেই বলা হলো, বেঁচে নেই। এরপর তিনি আমার স্বামীকে বললেন- আপনি কে? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, এ বাড়ির বাবুর্চি। কিন্তু ওসি তাকে চিনতে পারেন। ওই সময় ওসি বলেছিলেন, “আপনি পালিয়ে যান, এদের আমি দেখছি।”
এরপর সেই ওসি (আনোয়ার ) পুলিশের জিপে করে আমাদের নিয়ে যান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

১৫ আগস্টে ঘাতকের আক্রমণে আহত সাহান আরা বলেন, আমার শাশুড়ি হাসপাতালের খাবার খেতে পারছিলেন না। এক নার্সের সহায়তায় আমার হাতের একখানা বালা বিক্রি করে গ্লুকোজ কিনে এনেছিলাম। আমাদের যখন সবার নাম কাটবে ঠিক করা হলো, ঠিক তখন শুনলাম শুধু আমাকে নিয়ে যাওয়া হবে ক্যান্টনমেন্টে। তখন অন্যরা রিলিজ নিতে আপত্ত জানালে তারা আর তাকে ক্যান্টনমেন্টে নেননি।
এই সময় তার বাবা তার সন্তান কান্তা আর সাদিককে বরিশালে নিয়ে যান।
সাহান আরা আব্দুল্লাহ বলেন, সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে গ্রামের বাড়ি যাই। এক পর্যায়ে সন্তানদের নিয়ে কোনোভাবে ভারত গিয়ে আশ্রয় নেই, সেখানেই ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্বামীর সাথে দেখা হয়।

বাবার মুখে আজ শুনতে চাই

বরিশাল সিটি মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ বলেছেন,পচাত্তরের নির্মম ঘটনার সময় আমি ছোট ছিলাম। তখন কিছুই বুঝিনি। বাবার মুখ থেকেও কখনো আগস্টের কোন ঘটনা শুনিনি, ভয়ে শুনতেও চাইনি। যা শুনেছি মায়ের কাছ থেকে। আজ বাবার মুখ থেকে শুনতে চাই। তাই আমি কিছু বলবো না,বাবার কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছি।

১৫ আগস্টের নির্মমতার শিকার ক্রিডেন্সের শিল্পীদরে কয়েকজন-বরিশাল নিউজ


৪৪ বছর পর ডাক পোলাম

১৫ আগস্ট স্মরণে কত অনুষ্ঠান হয়, কেউ কখনো আমাদের ডাকেনি। আজ ৪৪ বছর পর প্রশাসন আমাদের ডেকেছেন। এ কথা বললেন পচাত্তরের ১৫ আগস্টের নির্মমতার শিকার ক্রিডেন্সের শিল্পী খন্দকার জিল্লুর রহমান। তিনিসহ ক্রিডেন্সের শিল্পীরা সেদিন মন্ত্রী আবদুর রহমান সেরনিয়াবাত এর বাসায় ছিলেন।
শরীরে গুলি নিয়ে আজও যন্ত্রণায় কাটাচ্ছেন তারা। জিল্লুর বলেন মহিউদ্দিন মানিক বীরপ্রতীক হাসপাতালে সেদিন তার গলার স্বর্নের চেইন বিক্রি করে তাদের চিকিৎসার টাকা দিয়েছিলেন।

স্বাক্ষী হয়ে গেলাম আজ
ব্যান্ড শিল্পীদের জন্য সেদিন রাতে রব সেরনিয়াবাত বাসায় জায়গা ছিলনা। তাই রাত ২-৪০ মিনিটে বাসা থেকে চলে যাই বললেন মহিউদ্দিন মানিক বীরপ্রতীক। বাইরে বসে তিনি শুনতে পান বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে।
মোটর সাইকেল নিয়ে তখন আবার তিনি ফিরে যান সেরনিয়াবাতের বাসায়। সেখানে রমনা থানার ওসিসহ পুলিশ আহতদের নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন।
বরিশাল নিউজ/এমএম হাসান