সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

বরিশাল নিউজ ডেস্ক।। সম্প্রতি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেওয়াসহ বেশ কিছু প্রোগ্রাম হাতে নিয়ে রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজধানী ঢাকার গণভবনে আজ সোমবার সেই সফর নিয়ে সাংবাদিকদের জানাতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সেখানে চীন সফরসহ রোহিঙ্গা ইস্যু, চাকরির বয়স ৩৫ করা, সাম্প্রতিক হরতাল, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, রাখাইনকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বরিশাল নিউজের পাঠকের জন্য তারই চুম্বকাংশ উপস্থাপন করা হলো:

যে যুক্তিতে চাকরির বয়স ৩৫ না করা হচ্ছেনা

সংবাদ সম্মেলনে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর না করার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তিনটি বিসিএস পরীক্ষার ফলাফল তুলে ধরেন। সেখানে দেখা যায় ২৩ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে যারা পরীক্ষা দেয় তাদের পাসের হার ৪০-এর ওপরে আর ২৯ বছরের পরে যারা পরীক্ষা দেয় তাদের পাসের হার ৩ শতাংশের মতো।
তিনি বলেন, ৩৫ বছর হলে কি অবস্থা হবে, হয়তো পাসের জন্য কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলে এ ব্যাপারে তিনি নিরুৎসাহিত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন শিক্ষার্থী ১৬ বছরে এসএসসি পাস করে। এইচএসসি ও অনার্স-মাস্টার্স করতে আরও ৭ বছর। সব মিলে ২৩ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে একজন শিক্ষার্থী মাস্টার্স পাস করে বের হয়। ২৩ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত বিসিএস পরীক্ষায় ভালো করতে পারে। এরপর যারা পরীক্ষা দেয় তারা ভালো করতে পারে না। সুতরাং চাকরির ক্ষেত্রে ৩৫ বছর করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা দেশবাসী বিচার করবে।
৩৫তম বিসিএসের ফল প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে যারা বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, তাদের পাসের হার হলো ৪০ দশমিক ৭ ভাগ, ২৫ থেকে ২৭ বছর যাদের বয়স, তাদের পাসের হার হলো ৩০ দশমিক ২৯ ভাগ। ২৭ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের পাসের হার হলো ১৩ দশমিক ১৭। ২৯ বছরের বেশি বয়সীদের পাসের হার ৩ দশমিক ৪৫ ভাগ।’
৩৬তম বিসিএসের ফল প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের পাসের হার ৩৭ দশমিক ৪৫ ভাগ। ২৫ থেকে ২৭ বছর বয়সীদের পাসের হার ৩৪ দশমিক ৭৮ ভাগ। ২৭ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের পাসের হার ১৪ দশমিক ৮৯ ভাগ। ২৯ বছরের বেশি বয়সীদের পাসের হার ৩ দশমিক ২৩ ভাগ।’
৩৭তম বিএসএসের ফল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের পাসের হার ৪৩ দশমিক ৬৫ ভাগ। ২৫ থেকে ২৭ বছর বয়সীদের পাসের হার ২৩ দশমিক ৩৫ ভাগ। ২৭ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের পাসের হার ৭ দশমিক ২০ ভাগ। ২৯ বছরের বেশি বয়সীদের পাসের হার ০ দশমিক ৬১ ভাগ।’
বিসিএসের তিন পর্বের ফল বিশ্লেষণ করে শেখ হাসিনা প্রশ্ন করেন, ‘কোনটা গ্রহণ করব এখন বলুন। আমি আর কিছু বলতে চাই না, আমি কেবল হিসাবটা দিলাম। চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ পর্যন্ত করলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে, আমাকে একটু বুঝিয়ে বলুন। কারণ তখন তো বিয়েশাদি হবে, ছেলে-মেয়ে হবে, ঘর সামলাতে হবে, বউ সামলাতে হবে আর বই কিনতে হবে। তখন তো আরও করুণ অবস্থা হয়ে যাবে। কাজ করার একটা সময় থাকে। একটা এনার্জি থাকে। এই যে একটা দাবি তোলা, এখন দাবি তোলার জন্য যদি দাবি তোলা হয়, আমার কিছু বলার নেই। এই দাবি তোলার জন্য কোনও না কোনও জায়গা থেকে নিশ্চয় কোনও প্রেরণা পাচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৩৫ বছর বয়সে পরীক্ষা দিলে এর রেজাল্ট, ট্রেনিং, ট্রেনিং শেষ হতে যদি আরও দুই বছর লাগে, তাহলে ৩৭ বছর গেলো। ৩৭ বছরে চাকরি হলে কী হবে? চাকরির বয়স কিন্তু ২৫ বছর না হলে ফুল পেনশন পাবে না। ঠিক আছে, পেনশন না পেলো। তাহলে একটা সরকার কাদের দিয়ে চালাবো? আমরা সবসময় বলি, যারা মেধাবী, তরুণ, কর্মক্ষম তাদের দিয়েই তো আমাদের দেশের উন্নয়ন কাজ করবো। কিন্তু বয়স বাড়লে তো কাজের গতিও কমে। এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। যাই হোক, আমি শুধু হিসাবটাই দিলাম, দেশবাসী বিচার করুক, আপনারও বিচার করুন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা জানেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ছিল প্রাচ্যের অক্সফোর্ড, আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময় ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু ’৭৫-এ জাতির পিতাকে হত্যার পর আমরা কী দেখেছি? একটা শ্রেণি নেমে গেলো অস্ত্র হাতে। গুলি-বোমা-অস্ত্রের ঝনঝনানি ছাড়া আর কিছুই শোনা যেতো না। সেশনজট তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। আমরা আসার পর ধীরে ধীরে সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছি।’

বাম-ডান মিলে গেছে এক সুরে

গ্যাসের মূলবৃদ্ধির প্রতিবাদে ডাকা হরতালে ‘বাম-ডান মিলে গেছে এক সুরে’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনা বলেন, বাম আর ডান মিলে গেছে। এক সুরে। এই তো? খুব ভালো।
তিনি বলেন, আমাদের গ্যাসের প্রয়োজন আছে কি-না? দেশের যদি আমরা উন্নয়ন করতে চাই, এনার্জি একটা বিষয়। এলএনজির জন্য খরচ যথেষ্ট বেশি পড়ে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকে আন্দোলন করেছে আবার বলেছে, ভারতে দাম কমিয়েছে।
এ সময় ভারত ও বাংলাদেশে গ্যাসের দামের পার্থক্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দাম বাড়ানোর পরও ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তাহলে আমি এক কাজ করি, যে দামে কিনব সে দামে বিক্রি করি? বহুদিন পর হরতাল পেয়েছেন পরিবেশের জন্য ভালো।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স চমৎকার : প্রধান

বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স অত্যন্ত চমৎকার বলে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেট খেলে, যেমন- বড় বড় দল তাদের পর্যন্ত হারিয়ে দিয়েছে। সাকিব, মোস্তাফিজ বিশ্বকাপে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশ যথেষ্ট উন্নতি করছে। হয়তো সেমিতে যেতে পারেনি। চারটি দল সেমিতে গেছে। যে দলগুলো বাদ পড়েছে তারা সবাই কি খারাপ দল। দীর্ঘদিন ধরে যারা ক্রিকেট খেলছে তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করেছে আমাদের ছেলেরা। এই সাহসই তো বড় কথা। সবাই যে সব খেলায় জিতবে এমন কোনো কথা নয়। তা ছাড়া ভাগ্যও লাগে।
শেখ হাসিনা বলেন, খেলায় ধীরে ধীরে বাংলাদেশ আরও উন্নতি করবে। ছেলেরা খেলায় যাতে আরও ভালো করতে পারে সে বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। আগের চেয়ে বাংলাদেশের অনেক উন্নতি হয়েছে। আমাদের ছেলেদের আমি নিরুৎসাহিত করি না। অস্ট্রেলিয়া ৩৮৬ করেছে তার বিপরীতে বাংলাদেশ ৩৩৩ রান করেছে। এটা কম কিসে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।

মার্কিন কংগ্রেসম্যানের কথা অত্যন্ত গর্হিত, অন্যায়

মার্কিন কংগ্রেসম্যান শ্যারনের রাখাইনকে বাংলাদেশের মানচিত্রের সঙ্গে জুড়ে দেয়ার কথা অত্যন্ত গর্হিত কাজ, অন্যায় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনা বলেন, আমার যে সীমানা আছে, তাতেই আমরা খুশি। অন্যের জমি নিয়ে আসা বা অন্যের কোনো প্রদেশ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এটা আমরা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করি। এটা আমরা কখনই নেব না। প্রত্যেক দেশ তার সভরেন্টি নিয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, মিয়ানমার তার সভরেন্টি নিয়ে থাকবে। সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে রাখাইন স্টেট জুড়ে দিতে চায় কেন? এ ধরনের কথা বলা এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ, অন্যায় বলে আমি মনে করি। হতে পারে তারা খুব বড় দেশ। সে দেশের একজন কংগ্রেসম্যান। কিন্তু তারা কী তাদের অতীত ভুলে গেছে? তাদের যখন গৃহযুদ্ধ লেগেই থাকতো। সেই অতীত তো তাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়। সেটা যে ভবিষ্যতেও আসবে না সেটা তারা কীভাবে ভাবে?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাখাইন স্টেটে প্রতিনিয়ত যে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে তা আমরা জেনে-বুঝে ওই ধরনের একটা গোলমাল জিনিস আমার দেশের সঙ্গে যুক্ত করব কেন? এটা আমরা কখনই করব না। আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার। সেখানকার লোকেরা যখন আশ্রয় চেয়েছে, মানবিক কারণে আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি।তিনি বলেন, আশ্রয় দেয়ার অর্থ এটা নয় যে, আমরা তাদের রাষ্ট্রের একটা অংশ নিয়ে চলে আসব। এ মানসিকতা আমাদের নেই, এটা আমরা চাই না। প্রত্যেকটা দেশ তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে থাকবে, সেটাই আমরা চাই। আমরা এটাও চাই যে, এ কথা না বলে বরং মিয়ানমার যেন তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় এই কংগ্রেস ম্যান শ্যারনের সেটাই করা উচিত। সেটাই হবে মানবিক দিক। সেখানে যে সব মানবতা লঙ্ঘন হচ্ছে, যা কিছু হয়েছে তাদের সেটা দেখা উচিত। এভাবে একটা দেশের ভেতরে একটা গোলমাল পাঁকানো এটা কোনো মতেই ঠিক নয়।
শেখ হাসিনা বলেন, যেখানেই তারা হাত দিয়েছে সেখানেই তো আগুন জ্বলছে। কোথাও তো শান্তি আসেনি বরং জঙ্গিবাদ সৃষ্টি হয়েছে। অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের অঞ্চলটা আমরা একটু শান্তিপূর্ণভাবে থাকার চেষ্টা করছি। এখানেও তাদের আগুন লাগানোর প্রচেষ্টা। এটা কখনই গ্রহণযোগ্য নয়।
রোহিঙ্গা-সংক্রান্ত অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা (চীন) বলেছেন, বিষয়টা তারা বিবেচনা করবেন, দেখবেন। এটা কী সুখবর মনে হচ্ছে না? না, দুঃখের খবর মনে হচ্ছে? এটা ঠিক যে চীন মিয়ানমারের সঙ্গে সব সময় আছে। এই যে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আছে। এটা যে বাংলাদেশের জন্য বিরাট সমস্যা এই কথাটা তো তারা নিজেরা উপলব্ধি করতে পারছে। সেই জন্যই মনে করছেন এ বিষয়টার দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত। এজন্য তারা যতটুকু করার প্রয়োজন ততটুকু করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।