বধ্যভূমিতে রেস্টুরেন্ট;‘‘আপনারা না ভাঙলে আমরা ভাঙবো’’

বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভের সামনে সমাবেশ করেন বরিশাল জেলা ও মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ-বরিশাল নিউজ

বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভের সামনে সমাবেশ করেন বরিশাল জেলা ও মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ-বরিশাল নিউজ

বরিশাল নিউজ।। বরিশালে বধ্যভূমিতে গড়ে ওঠা রেস্টুরেন্ট উচ্ছেদের ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম শেষ হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টায়। এই সময়ের মধ্যে প্রশাসন তা উচ্ছেদ না করলে নিজেরাই ওই ভবন গুড়িয়ে দেবেন বলে জানিয়েছেন বরিশালের মুক্তিযোদ্ধারা।
কীর্তণখোলা নদীর পাড়ে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভের সামনে বৃহস্পতিবার সকালে এক সমাবেশে এ হুশিয়ারি দেন তারা।
বরিশাল জেলা ও মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ওই সমাবেশের আয়োজন করে। সঞ্চালনা করেন মুক্তিযোদ্ধা এনায়েত হোসেন চৌধুরী। তিনি এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। সংস্কৃতিজন সৈয়দ দুলাল সিটি কর্পোরেশন থেকে পাওয়া তথ্য থেকে রেস্টুরেন্টের ছয়জন মালিকের নাম প্রকাশ করেন।

'আমরা আছি'' স্লোগান দিয়ে বধ্যভূমি এলাকায় গড়ে ওঠা রেস্টুরেন্ট প্রদক্ষিণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা-বরিশাল নিউজ

‘আমরা আছি” স্লোগান দিয়ে বধ্যভূমি এলাকায় গড়ে ওঠা রেস্টুরেন্ট প্রদক্ষিণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা-বরিশাল নিউজ

সমাবেশ শেষে রেস্টুরেন্ট নির্মাণকারীদের ‘‘আমরা আছি’’ হুশিয়ারি দিয়ে ওই ভবন প্রদক্ষিণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। নেতৃত্বের নিষেধ সত্ত্বেও কয়েকজন ক্ষুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা নির্মানাধীন রেস্টুরেন্টটির সাটারে ইট-পাটকেল ও থুঁথুঁ ছোড়েন।
সমাবেশে বক্তব্য দেন বরিশালের মুক্তিযোদ্ধাসহ বিভিন্ন অঙ্গণের লোকজন। বধ্যভূমির জায়গায় রেস্টুরেন্ট নির্মাণ ও এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন তারা। তারই চুম্বকাংশ বরিশাল নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

‘‘আপনারা না ভাঙলে আমরা ভাঙবো’’

বেধে দেওয়া সময়ের মধ্যে অবৈধ রেস্টুরেন্টটি উচ্ছেদ না হলে আন্দোলনের নেতারা পরবর্তীতে কি করবেন?- মুক্তিযোদ্ধা ও ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ মো. মহসীন উল ইসলাম হাবুল, এ প্রশ্ন করলে জবাব দেন বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। তাদের একজন প্রদীপ কুমার ঘোষ পুতুল বলেন,‘‘শহীদ কাঞ্চন, সুধীর চক্রবর্তীসহ অনেক বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধাকে এখানে এনে হত্যা করা হয়েছে। তাদের স্মৃতি বিজড়িত এই জায়গায় এমন নষ্টামি হতে দেওয়া যায় না।’’
‘‘তাই আজকের মধ্যে এই রেস্টুরেন্ট আপনারা ভাঙলে ভালো । আর আপনারা না ভাঙলে আমরা ভাঙবো। তখন সব দায়িত্ব কিন’ আপনাদের। আমাদের কিছু করার থাকবে না।’’ প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বলেন প্রদীপ কুমার ঘোষ।
সাংবাদিক সুশান্ত ঘোষ বলেন,‘‘আজকে ছয়টার মধ্যে ৪৮ ঘন্টা শেষ । এরমধ্যে আপনারা সিদ্ধান্ত নিলে নেবেন না হলে জনগন সিদ্ধান্ত নেবে।’’

‘‘হামার লইয়া কবে আমু?’’

ওই বক্তব্যের সাথে সাথেই কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা দাড়িয়ে বলতে শুরু করেন,‘‘এইডা কবে ভাঙবেন কন। হামার লইয়া কবে আমু?’’

‘‘মান-সম্মান নিয়া ফেরত যান’’

সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের পক্ষে বক্তব্য দেন এহসান রাব্বি। বৃদ্ধ বয়সে মুক্তিযোদ্ধাদের আন্দোলনে নামতে হয়েছে এজন্য ক্ষমা চেয়ে রাব্বি বলেন,‘‘এই আন্দোলন আসলে আমাদের করা উচিত। আপনাদের তো এখন আরাম আয়েশে বাসায় থাকার কথা। তবু এদেশের কিছু কুলাঙ্গারের জন্য আপনাদের মাঠে নামতে হয়েছে। যারা এখানে এই স্থাপনা নির্মাণ করেছেন তাদের বলছি, মান সম্মান নিয়ে ফেরত যান। এইসব স্থাপনা আপনার বাড়িতে গিয়া বানান। আমাদের সমস্যা নাই। কিন্তু বধ্যভূমির জায়গায় এসব চলবে না।’’

‘‘বেআইনী, তবু এরা কিসের জোরে এগুলা করে!’’

বধ্যভূমি সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে উদ্বৃত করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মহানগর কমান্ডার মোখলেছুর রহমান কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘‘বধ্যভূমির ৫০ গজের মধ্যে কোনো বানিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা বেআইনী। তবু এরা কিসের জোরে এগুলা করে! সেটা খতিয়ে দেখা জরুরী।’’

নদীর পাড় ঘেষে গড়ে ওঠে রেস্টুরেন্টটি-বরিশাল নিউজ

নদীর পাড় ঘেষে গড়ে ওঠে রেস্টুরেন্টটি-বরিশাল নিউজ

‘‘আরো কঠিন আন্দোলন হবে’’

তিন বছর আগে পাশ হওয়া নদী আইন উদ্ধৃত করে বরিশাল নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতা কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন,‘‘ নদী পাড়ের ১২০ ফুটের মধ্যে বানিজ্যিক ভবন তোলা যাবে না। কিন্তু এখানেতো দেখি ১০-১২ ফুটের মধ্যেই আছে। যাহোক আজকে সন্ধ্যার মধ্যে এই ভবন না ভাঙলে আরো কঠিন আন্দোলন হবে।’’

‘‘সিটি কর্পোরেশন লিজ দেয় কিভাবে’’

উন্নয়ন সংগঠক ও গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের শুভংকর চক্রবর্তী বলেন,‘‘জেলা প্রশাসনের ১নং খতিয়ানের খাস জমি হওয়া সত্ত্বেও সিটি কর্পোরেশন কিভাবে এই জমি লিজ দিল। সেটি জানা অতি জরুরি।’’ ঐ কর্মকর্তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে সাংবাদিকদের প্রতি আহবান জানান তিনি।

জেলা প্রশাসন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পর রেস্টুরেন্টের সাটারে তালা-বরিশাল নিউজ

জেলা প্রশাসন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পর রেস্টুরেন্টের সাটারে তালা-বরিশাল নিউজ

‘‘তালার মালিক কারা?’’

জেলা প্রশাসন ওই রেস্টুরেন্টের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পর যারা তালা মেরেছেন সেই তালার মালিকদের নাম জানতে চেয়েছিলেন বরিশাল মেট্রোপলিটন প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন,‘‘এই আন্দোলন ব্যর্থ হলে। আগামীকাল আরো স্থাপনা এই বধ্যভূমির জায়গাটা ভরে ফেলবে। তাই আন্দোলন যেন থেমে না যায়।’’

‘‘আর কতদিন?”

মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন মানিক বীর প্রতীক বলেন,‘‘৪৭ বছর তো হলো আর কত? আর কতদিন মুক্তিযুদ্ধে বিষয়গুলো নিয়ে আন্দোলন করতে হবে?’’
তিনি বলেন,‘‘এখানে মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতি আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে। লঞ্চযাত্রীরা আগে ছবি তুলতো স্মৃতিস্তম্ভের এখনতো নদী থেকে স্মৃতিস্তম্ভ দেখা যায়না। দেখা যায় এই রেস্টুরেন্ট।’’
ক্ষুদ্ধ মহিউদ্দিন মানিক বলেন,‘‘মানুষ যদি মানুষের মতো কর্মকান্ড না করে তাহলে তার সাথে অমানুষের মতো ব্যবহার করতে হয়।’’

‘‘ভবনের সাথে মালিকের হাত-পা ও গুড়িয়ে দিতে হবে’’

‘‘বধ্যভূমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনার সাথে এর মালিকেরও হাত-পা গুড়িয়ে দিতে হবে।’’ বলে মন্তব্য করেন মহিউদ্দিন মানিক বীর প্রতীক। বধ্যভূমি সংরক্ষণ পরিষদের আহবায়ক মানবেন্দ্র বটব্যাল বলেন,‌‌”যারা এর সাথে জড়িত তাদেরও হাত-পা ভেঙে দেবো।”

বরিশাল নিউজ/শাওন

Comments

comments

২০১৮-০৯-১৩T১৭:২৩:২২+০০:০০বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮ ২:৪৭ অপরাহ্ণ|